হাওজা নিউজ এজেন্সি: লেবাননের হিজবুল্লাহর নেতা শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এই সংগ্রামী আলেমের ব্যক্তিত্ব ও তাঁর সংগ্রাম সম্পর্কে ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার বক্তব্যগুলো পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন ও তাদের সফলতার জন্য দোয়া
“লেবাননের হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব পরিষদের সদস্য হিসেবে আপনাদের ওই সংবেদনশীল অঞ্চলে উপস্থিতি ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত বড় একটি নিয়ামত। আমরা আশা করি, মহান আল্লাহ আপনাদের সফলতা দান করবেন এবং যা তাঁর সন্তুষ্টির কারণ, সে পথে আপনাদের সহযোগিতা ও হেদায়াত করবেন...
আমি সবসময় আপনাদের জন্য দোয়া করি। তবে শুধু আমিই নই; অনেকেই আপনাদের জন্য দোয়া করেন এবং মহান আল্লাহর কাছে আপনাদের সফলতা কামনা করেন। তাঁরা বিনীতভাবে প্রার্থনা করেন, মহান আল্লাহ যেন আপনাদের পথচলায় সফলতা দান করেন। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ দোয়া কবুল করবেন এবং আপনারা আপনাদের কাজে সফল হবেন।”
৩ ডিসেম্বর ১৯৯৮
হিজবুল্লাহ ও সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য প্রয়োজন সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি
“আপনারা দেখছেন, কোনো কোনো তথাকথিত বুদ্ধিজীবী—উদাহরণস্বরূপ—লেবাননের হিজবুল্লাহ, সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ কিংবা এ ধরনের কোনো বিষয় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এর কারণ হলো, তাঁরা ওই পরিবেশকে সঠিকভাবে চেনেন না। এটাই যদি তাঁদের ব্যাপারে সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাখ্যা হয়।
অবশ্য এর একটি নেতিবাচক ব্যাখ্যাও হতে পারে। কিন্তু ইতিবাচক ব্যাখ্যা হলো—তাঁরা জানেন না ওই অঞ্চলে কী ঘটছে; তাঁরা জানেন না সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ বলতে কী বোঝায়, হিজবুল্লাহ কী, ইরানের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী এবং দেশের ভাগ্য ও বিপ্লবের ভবিষ্যতের ওপর এর কী প্রভাব রয়েছে। এই অজ্ঞতার কারণেই এমন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়, দেশ ও বিশ্বের পরিস্থিতির দিকে খোলা চোখে তাকাতে হবে। কয়েক বছর আগে আমি এর জন্য ‘বাসিরাত’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলাম। কেউ কেউ এতে বিরক্ত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘বাসিরাত, বাসিরাত—কেন আপনি বারবার বাসিরাতের কথা বলেন?’ কিন্তু এটাই তো বাসিরাত; অর্থাৎ খোলা চোখে বাস্তবতাকে দেখা।”
১২ জুলাই ২০১৬
শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ: আঞ্চলিক প্রতিরোধের গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
“যদি শহীদ সিনওয়ারের মতো ব্যক্তিত্বরা আবির্ভূত না হতেন, যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছেন, তাহলে এ অঞ্চলের পরিস্থিতি এক রকম হতো। কিন্তু এখন যেহেতু তাঁরা আবির্ভূত হয়েছেন, পরিস্থিতি অন্য রকম হয়েছে।
একইভাবে, যদি শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর মতো মহান ব্যক্তিত্বরা আবির্ভূত না হতেন—যাঁরা জিহাদ, প্রজ্ঞা, সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার গুণগুলোকে একত্রিত করে ময়দানে নিয়ে এসেছেন—তাহলে এই আন্দোলনের গতিপথও এক রকম হতো। কিন্তু তাঁরা আবির্ভূত হওয়ায় এর গতিপথ ভিন্ন হয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
২ নভেম্বর ২০২৪
শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ: হিজবুল্লাহর বিকাশ ও শক্তি অর্জনের স্থপতি
“আমাদের প্রিয় সাইয়্যেদ শহীদদের উচ্চ মর্যাদায় আরোহণ করেছেন এবং তিনি যে আকাঙ্ক্ষা লালন করতেন, তাতে পৌঁছেছেন। তবে তিনি এখানে একটি স্থায়ী স্মৃতিচিহ্নও রেখে গেছেন, আর তা হলো ‘হিজবুল্লাহ’।
সাইয়্যেদের সাহসিকতা, প্রজ্ঞা, অসাধারণ ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের বরকতে হিজবুল্লাহ বিকশিত হয়েছে; অভূতপূর্বভাবে উন্নতি করেছে। প্রকৃতপক্ষে এটি এমন একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে, যার ওপর নানা ধরনের বস্তুগত অস্ত্র, বক্তব্য, প্রচার ও গণমাধ্যমের শক্তিতে সজ্জিত শত্রুও প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও পারবে না।
মরহুম সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ হিজবুল্লাহকে এমন একটি সংগঠন ও বাস্তবতায় পরিণত করেছেন।”
১৭ নভেম্বর ২০২৪
সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শাহাদাত: প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা ও হতাশ না হওয়ার বার্তা
“আমরা সবাই আমাদের প্রিয় সাইয়্যেদের [শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ] শাহাদাতে শোকাহত। এটি একটি বিরাট শূন্যতা এবং নিঃসন্দেহে আমাদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে। তবে আমাদের এই শোক বিষণ্ণতা, অস্থিরতা কিংবা হতাশার শোক নয়; এটি ইমাম হুসাইন ইবনে আলীর (আ.) জন্য শোকের মতো—যে শোক মানুষকে জীবন্ত করে, শিক্ষা দেয়, প্রেরণা জোগায় এবং আশা সৃষ্টি করে।
সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর দেহ আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছে; কিন্তু তাঁর প্রকৃত ব্যক্তিত্ব, তাঁর আত্মা, তাঁর পথ এবং তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠ আমাদের মাঝে ছিল এবং থাকবে। তিনি ছিলেন অত্যাচারী ও লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের উঁচু পতাকা; তিনি ছিলেন মজলুমদের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ ও সাহসী রক্ষক; তিনি ছিলেন সংগ্রামী ও ন্যায়সন্ধানীদের জন্য সাহস ও আশ্বাসের উৎস।
লেবানন, ইরান ও আরব দেশগুলোর গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল। আর এখন তাঁর শাহাদাত এই প্রভাব আরও বৃদ্ধি করবে।
তাঁর জীবদ্দশায় কথায় ও কাজে লেবাননের বিশ্বস্ত জনগণের জন্য তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল—ইমাম মুসা সাদর, সাইয়্যেদ আব্বাস মুসাভি ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে হতাশ ও বিভ্রান্ত হবেন না; সংগ্রামের পথে দ্বিধা করবেন না; নিজেদের প্রচেষ্টা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করুন; নিজেদের ঐক্য আরও দৃঢ় করুন এবং ঈমান ও তাওয়াক্কুল শক্তিশালী করে আগ্রাসী ও আক্রমণকারী শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন এবং তাকে ব্যর্থ করে দিন।
আমার প্রিয়জনেরা! লেবাননের বিশ্বস্ত জনগণ! হিজবুল্লাহ ও আমলের উদ্যমী তরুণেরা! আমার সন্তানেরা! আজও আমাদের শহীদ সাইয়্যেদের তাঁর জনগণ, প্রতিরোধ ফ্রন্ট এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর প্রতি একই আহ্বান।
নিকৃষ্ট ও দুর্বল শত্রু যখন হিজবুল্লাহ, হামাস, ইসলামিক জিহাদ এবং আল্লাহর পথে সংগ্রামরত অন্যান্য সংগঠনের সুদৃঢ় কাঠামোর ওপর গুরুতর আঘাত হানতে পারে না, তখন সে সন্ত্রাস, ধ্বংস, বোমাবর্ষণ, বেসামরিক মানুষ হত্যা এবং নিরস্ত্র মানুষকে শোকাহত করাকে নিজের বিজয় হিসেবে প্রচার করে।
এর ফল কী? এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানুষের ক্ষোভকে আরও সঞ্চিত করে, তাদের প্রেরণা বাড়িয়ে দেয়, আরও বেশি সংগ্রামী, সেনাপতি, নেতা ও আত্মোৎসর্গকারী মানুষের উত্থান ঘটায়, রক্তপিপাসু নেকড়ের চারপাশের অবরোধ আরও সংকুচিত করে এবং শেষ পর্যন্ত—ইনশাআল্লাহ—তার কলঙ্কজনক অস্তিত্বকে দৃশ্যপট থেকে মুছে দেয়।”
১৩ অক্টোবর ২০২৪
তিন দশকের সংগ্রামে হিজবুল্লাহকে ধাপে ধাপে শক্তিশালী করেছিলেন শহীদ হাসান নাসরুল্লাহ
“প্রিয় সাইয়্যেদ [শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ] ত্রিশ বছর ধরে একটি কঠিন সংগ্রামের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি ধাপে ধাপে হিজবুল্লাহকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন: ‘যেমন একটি শস্যবীজ তার অঙ্কুর বের করে, তারপর তাকে শক্তিশালী করে তোলে; একপর্যায়ে তা নিজের কাণ্ডের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায় এবং কৃষকদের বিস্মিত করে—যাতে আল্লাহ এর মাধ্যমে কাফেরদের ক্রুদ্ধ করেন। তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’
সাইয়্যেদের বিচক্ষণ নেতৃত্বে হিজবুল্লাহ ধাপে ধাপে, ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থাকে পিছু হটিয়ে শত্রুদের সামনে তার সক্ষমতা প্রকাশ করেছে: ‘তার ফলন প্রতিনিয়ত তার প্রতিপালকের অনুমতিতে প্রদান করে।’
প্রকৃত অর্থেই হিজবুল্লাহ একটি ‘শাজারাতুত তাইয়্যিবা’ বা ‘পবিত্র বৃক্ষ’। হিজবুল্লাহ এবং তার বীর ও শহীদ নেতা লেবাননের ঐতিহাসিক ও পরিচয়গত গৌরবের নির্যাস।”
১৩ অক্টোবর ২০২৪
আপনার কমেন্ট